বৃহস্পতিবার ৫ই মার্চ, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ২০শে ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শিরোনাম >>
শিরোনাম >>

চট্টগ্রাম বন্দরে থমথমে অবস্থা,গ্রেপ্তার আতঙ্কে আন্দোলনকারীরা

ঢাকা ব্যুরো   |   রবিবার, ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬   |   প্রিন্ট   |   ৫০ বার পঠিত   |   পড়ুন মিনিটে

চট্টগ্রাম বন্দরে থমথমে অবস্থা,গ্রেপ্তার আতঙ্কে আন্দোলনকারীরা

চট্টগ্রাম নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলসহ চার দফা দাবিতে চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান আন্দোলন ঘিরে চরম উত্তেজনা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ১৫ জন শ্রমিক-কর্মচারীকে শাস্তিমূলক বদলি, দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার উদ্যোগ এবং অবৈধ সম্পদ তদন্তের ঘোষণার পর গ্রেপ্তার আতঙ্কে আত্মগোপনে রয়েছেন বন্দর রক্ষা আন্দোলনের নেতাকর্মীরা। রোববার (০৮ ফেব্রয়ারি) ঢাকায় বিডা চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেছেন, এ সরকারের আমলে বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে বন্দর ইজারার চুক্তি হচ্ছে না। তার এ ঘোষণার পর আন্দোলন নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের দেওয়া কর্মসূচির অংশ হিসেবে গত ৩১ জানুয়ারি থেকে টানা তিন দিন প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে কাজ বন্ধ রাখেন শ্রমিকরা। পরে গত মঙ্গলবার থেকে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু হলে বন্দরে কনটেইনার পরিবহন কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টির অভিযোগে ছয়জন শ্রমিক-কর্মচারীকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাত থেকে রোববার সকাল পর্যন্ত বন্দর এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের তুলে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন। যদিও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিষয়টি স্বীকার করেনি।

ইব্রাহিম খোকন বলেন, শনিবার রাত থেকে রবিবার সকাল পর্যন্ত সংগ্রাম পরিষদের দুজন প্রবীণ নেতাসহ মোট ছয়জনকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নেওয়া হয়েছে। বন্দর চেয়ারম্যান শক্তি প্রয়োগ করে আন্দোলন দমন করতে চাইছেন। শক্তি প্রয়োগ হলে আরও কঠিন আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। আলোচনা ছাড়া আন্দোলন দমন করা যাবে না।

ডিবি পরিচয়ে তুলে নেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন আবুল কালাম, শামসুল মিয়া টুকু, রিপন ও আসাদুল। এর আগে চলমান আন্দোলনের আড়ালে নৈরাজ্য সৃষ্টি ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ১৫ জন কর্মচারীকে শাস্তিমূলক বদলি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা এবং সম্পদের হিসাব তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২ ফেব্রুয়ারি) চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হাসিম স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। আদেশে বলা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন, ২০২২ এর ৫০ ধারা অনুযায়ী জনস্বার্থে অভিযুক্ত ১৫ কর্মচারীকে বদলিপূর্বক মোংলা ও পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষের অধীনে সংযুক্ত করা হয়। বদলিকৃত কর্মচারীদের মধ্যে অডিট সহকারী, ইঞ্জিন ড্রাইভার, স্টেনো টাইপিস্ট, উচ্চ বহিঃসহকারী, ইসিএম ড্রাইভার ও মেসনসহ বিভিন্ন শ্রেণি ও পদের কর্মচারী রয়েছেন। পরে ৫ ফেব্রুয়ারি এটি স্থগিত করা হয়। এরপরেও আন্দোলন চালিয়ে গেলে আজ রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) তাদের বদলির স্থগিতাদেশ বাতিল করা হয়।

বদলির আদেশপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন, এনসিটি ইস্যুতে আন্দোলনের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবির (অডিট সহকারী), মো. ইব্রাহিম খোকন (ইঞ্জিন ড্রাইভার), মো. জহিরুল ইসলাম (স্টেনো টাইপিস্ট), মানিক মিস্ত্রি (ইসিএম ড্রাইভার) ও মো. শামসু মিয়া (মেসন)।

অফিস আদেশে আরও উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্ত কর্মচারীরা আন্দোলনের নামে বন্দর এলাকায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। এসব অভিযোগের তদন্ত চলমান রয়েছে। তদন্তের স্বার্থে তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারির জন্য আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) তাদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়। এসব ঘটনার পর গ্রেপ্তার আতঙ্কে বন্দর রক্ষা আন্দোলনের নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন আন্দোলনের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, আমরা গ্রেপ্তার আতঙ্কে আছি। তাই একটু দূর থেকে কাজ করছি।

রোববার বিকেলে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, এই সরকারের আমলে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দর ইজারা চুক্তি হচ্ছে না। তিনি বলেছেন, ডিপি ওয়াল্ডের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে একটু সময় চাওয়া হয়েছে। আমাদের হাতে মাত্র ২টি কার্যদিবস বাকি আছে। তাই এ সময়ের মধ্যে হচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়া হুমায়ুন কবির বলেন, আশিক চৌধুরী যদি ডিক্লেয়ার করে থাকেন এবং সরকার তাদের অবস্থান থেকে সরে আসে, তাহলে আন্দোলন নিয়ে ইতিবাচক ভাবা হবে। সে ক্ষেত্রে আন্দোলন স্থগিতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।

রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে শুরু হওয়া কর্মসূচির ফলে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের তিনটি টার্মিনাল ও বহির্নোঙরে পণ্য ওঠানামাসহ প্রায় সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। সকাল থেকে বন্দরের প্রধান জেটিতে থাকা ১২টি জাহাজ ও বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ ৮০টির বেশি পণ্যবাহী জাহাজ থেকে খালাস কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

বন্দরের ভেতরে কোনো ট্রেলার বা পণ্য পরিবহনের যানবাহন ঢুকতে দেখা হয়নি। পুরো এলাকায় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সব মিলিয়ে বন্দরের ইয়ার্ডগুলোতে অন্তত ৪০ হাজার আমদানিযোগ্য কনটেইনার আটকা পড়েছে। এ বাইরে ডিপোতে রপ্তানিযোগ্য ১২,৪৮৩ টিইউএস কনটেইনার আটকা আছে।

বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং এনড বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে রোববার বন্দর চেয়ারম্যানকে চিঠি দেয়া হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, বহির্নোঙরে মাদারভ্যাসেলে খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে রমজানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পণ্য চাল, ডাল, গম, চিনি, সয়াবিন। এছাড়াও কৃষিকাজে ব্যবহৃত পণ্যও রয়েছে। এদিকে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ এবং সদস্য সচিব নাজিমুর রহমান এক বিবৃতিতে গভীর উদ্বেগ ও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের একেবারে শেষ সময়ে এসে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র চার দিন আগে চট্টগ্রাম বন্দরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা নিউমুরিং কন্টেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) লিজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, প্রশ্নবিদ্ধ এবং জাতীয় স্বার্থ পরিপন্থি।

নেতারা বলেন, এই হঠকারী সিদ্ধান্তের ফলে ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যা দেশের শিল্প-বাণিজ্য, আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম এবং সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করছে। সামনে পবিত্র রমজান মাসকে কেন্দ্র করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় গভীর সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চরম ভোগান্তি ডেকে আনতে পারে।

নেতারা আরও অভিযোগ করে বলেন, তড়ি ঘড়ি করে এই চুক্তি সম্পাদনের প্রচেষ্টা দেশের জনগণের মধ্যে গভীর সন্দেহ, উৎকণ্ঠা ও অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। অস্বচ্ছ ও বিতর্কিত এ সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কৌশলগত নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানিয়ে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে পরিস্থিতি সমাধানে প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।

Facebook Comments Box
আরও
Chief Editor
Shahan Ahmed Chowdhury
Editor
J U Sumon
News Editor
Mehdi Hassan
UK Office
USA OFFICE
  • Hasan Hafizur Rahman
    264/A,Central Avenue
    Garden City
    NY 11040
    USA
সিলেট ব্যুরো
  • আব্দুর মুক্তাদির
    সিটি কর্পোরেশন মার্কেট (২য় তলা)
    চালিবন্দর, সোবহানীঘাট, সিলেট।
ঢাকা ব্যুরো
  • সৈয়দ আবু নাসের
    এমএস প্লাজা ২৮/সি/২ টয়েনবি সার্কুলার রোড, মতিঝিল বা/এ, ঢাকা-১০০০